আগের পর্ব: The Third Observer Problem | সূচীপত্র দেখুন
পরম স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালার সম্পর্কে মানুষের প্রশ্নের শেষ নেই। আর বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে উত্তর দেবার প্রচেষ্টাও তো কম হয়নি। তিনি কি “ক্লাস টিচারের মত” করে মানুষের ভবিষ্যত কর্ম প্রেডিক্ট করেন? নাকি তিনি “টাইম ট্র্যাভেলারের মত” ভবিষ্যত দেখে আসেন? অর্থাৎ, আমাদের মস্তিষ্ক বিভিন্ন পরিচিত উদাহরণের সাথে “তুলনা” করে পরম স্রষ্টাকে ব্যাখ্যা করতে চায়। এভাবে যখন নানান কিছুর সাথে আমরা স্রষ্টাকে তুলনা করে বলি যে, তিনি ওমুকের “মত” কিংবা “তিনি এমন”, “তিনি অমন” – তখন আল্লাহ তায়ালা সূরা ইখলাসের শেষ বাক্যে বলে দিচ্ছেন যে, কোনোকিছুই তাঁর সাথে তুলনীয় নয়: “ওয়ালাম ইয়া কুল্লাহু কুফুয়ান আহাদ।”
হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক!
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সাথে কোনোকিছুর তুলনা করে আমরা তাঁকে বুঝতে পারবো না। কেননা, “তাঁর মত” তো আর কোনোকিছুই নেই, কিভাবে তুলনার মাধ্যমে বুঝব? তাই যখনই বিভিন্ন তুলনামূলক উদাহরণের সাহায্যে স্রষ্টা সংক্রান্ত বিষয়কে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়, তখন সেটা হয় অসম্পূর্ণ, কিংবা ভুল। তেমনই দুটি ভুল হলো মানুষের ভাগ্যপ্রশ্নের উত্তরে ক্লাসটিচারের উদাহরণ দেয়া, কিংবা তাঁকে (নাউযুবিল্লাহ) টাইম ট্র্যাভেলার বানিয়ে ফেলা!
পাঠক, তুলনা করা মস্তিষ্কের কাজ। আমাদের মস্তিষ্ক সময়ের সাপেক্ষে স্রষ্টাকে চিন্তা করতে চায়, মাত্রার সাপেক্ষে স্রষ্টাভাবনা করতে চায়। কারণ জন্মের পর থেকে সারা দুনিয়াকে সে নিজের চোখ দিয়ে দেখে এসেছে, নিজের বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে এসেছে। সবকিছুকে সে পরিমাপ করেছে সময়ের তুলনায়, দেখেছে ত্রিমাত্রিক (three dimensional) হিসেবে। এইভাবে চলতে চলতে সে যেন বন্দী হয়ে গিয়েছে নিজের পারস্পেক্টিভের কাছেই। এমতাবস্থায় যখন সে পরিচিত হলো এমন সত্ত্বার সাথে, যিনি সকল মাত্রার ঊর্ধ্বে, যিনি প্রকৃত অসীম, ট্রু ইনফিনিটি – তখন সে স্তম্ভিত হয়ে গেল।
হ্যাঁ, আমাদের মানব মস্তিষ্কের শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছি আমরা। মানব মস্তিষ্কের ক্ষমতা নেই যে, সে সীমার ঊর্ধ্বে উঠবে। আমাদের এই গোটা দার্শনিক স্রষ্টাভাবনা তো সূরা ইখলাসের প্রথম তিন আয়াতেই বলা হয়ে যাচ্ছে। তারপর শেষ আয়াতে যেন বলা হচ্ছে যে, “থামো! তোমার ব্রেইন দিয়ে আর চিন্তা কোরো না। কোনো কূলকিনারা পাবে না। বিভিন্ন উদাহরণের সাথে স্রষ্টার তুলনা করবে? তোমার প্রভু তো তুলনার ঊর্ধ্বে! তাঁকে তোমার নিজের চোখ দিয়ে দেখবে? তোমার ঐ চোখ তো সীমিত। তোমার ব্রেইন দিয়ে বুঝবে? তোমার ব্রেইন তো মাত্রার ভিতরে চিন্তা করে, সেতো সীমার ঊর্ধ্বে উঠতে জানে না। তোমার স্রষ্টাকে আরো গভীরভাবে জানতে চাইলে এসো, তোমার মস্তিষ্ককে ত্যাগ করো। সীমার ঊর্ধ্বে ওঠো, স্রষ্টার চোখ দিয়ে দেখো!”
এ যেন মানব মস্তিষ্কে সরাসরি আঘাত! যেন ডিমের খোলস ভেঙে বের করে আনার প্রচেষ্টা। একটা পাখি যখন ডিমের ভিতরে থাকে, তখন সে ওটুকুকেই সমগ্র জগত মনে করে। কিন্তু যখন ডিমে তা দেয়া হয়, সেই উত্তাপই তাকে একটু একটু করে আঘাত করে যেন। তারপর একসময় ডিমের খোলসটা ভেঙে যায়। ক্ষুদ্র গণ্ডি পেরিয়ে বিশাল দুনিয়ায় প্রবেশ করে সে। একইভাবে আমরা বুদ্ধিবৃত্তির (intellect) জগতে বন্দী। জগতের সকলকিছুকে আমরা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে (intellectually) বুঝতে চেষ্টা করি। স্রষ্টাসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের বুদ্ধিবৃত্তিক জবাব (intellectual answer) দিয়ে আত্মতৃপ্তি অনুভব করি। কিন্তু সূরা ইখলাসের শেষ আয়াত আমাদের সেই খোলসে আঘাত করছে। আমাদেরকে বের করে আনতে চাইছে ক্ষুদ্র বুদ্ধিবৃত্তিক জগত থেকে। নিয়ে যেতে চাইছে সীমার ঊর্ধ্বে। এমন এক জগতে, যেখানে আমরা সরাসরি অনুধাবন করতে পারব: পরম স্রষ্টার দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষের ভবিষত কীরকম? [QR সুবহানাল্লাহ যিকরের তাৎপর্য]
কিন্তু পরম স্রষ্টার পারস্পেক্টিভ কি অর্জন করা সম্ভব?
প্রিয় পাঠক!
এখনই হয়ত আপনি একগাদা ইন্টেলেকচুয়াল প্রশ্নের শিকলে নিজেকে বন্দী করে ফেলছেন! ভাবছেন, সসীম সত্তা কিভাবে অসীম সত্তার পারস্পেক্টিভ থেকে দেখবে? মাত্রার ঊর্ধ্বে ওঠা কি আদৌ সম্ভব? তাহলে তো সসীমের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব থাকে না। ইত্যাদি আরো কত দার্শনিক ভাবনা এসে আঘাত করছে আপনাকে। ধর্মীয় দর্শনের চর্চা থেকে থাকলে এজাতীয় কথা হয়ত আপনার কাছে নতুন নয়। কিন্তু সেসবই মানব মস্তিষ্কের চিন্তা। চলুন আমরা এগিয়ে যাই, দেখি বুদ্ধিবৃত্তির খোলস ভেঙে বের হতে পারি কিনা। সূরা ইখলাস যে অনন্তের পথে যাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেই পথ খুঁজে পাই কিনা! হাতটি ধরুন, আসুন, এগিয়ে যাই…
_______________________________
সূরা ইখলাসের শেষ বাক্যই অনন্তের পথে যাত্রা।
“কোনোকিছুই তাঁর (আল্লাহর) সাথে তুলনীয় নয়।”
সসীমের পক্ষে কি সীমার ঊর্ধ্বে ওঠা সম্ভব? অন্য পাঠকেরা কী ভাবছেন?
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
আপনার মতামত জানান...